জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে: ডা. শফিকুর রহমান

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের কারামুক্তি উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান জনগণ ও প্রবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন; অন্যদিকে আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের অনিয়মের প্রতিবাদে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগ তুলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের কারাভোগ শেষে মুক্তিলাভ উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে আমীরে জামায়াত ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেন, জনগণের অধিকার, সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরে না আসা পর্যন্ত এ লড়াই চলবে, ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, এক মাস তিন দিন কারাভোগের পর আমাদের সম্মানিত সহকর্মী মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন—আলহামদুলিল্লাহ, আমরা মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি কোনো অন্যায় করেননি; বরং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে কারাভোগ করতে হয়েছে।

আমীরে জামায়াত বলেন, বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে যাত্রীদের দীর্ঘসময় অপেক্ষা করা, ট্রলির সংকট, লাগেজ থেকে মালামাল চুরি এবং অন্যান্য অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। প্রতিবাদের ভাষা কঠিন হলেও তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া ও সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলার অভিযোগে মামলা করা হয়, যা তার ভাষ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি আত্মসমর্পণ না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মেজর আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর বিমানবন্দরের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দফায় নতুন ট্রলি সংযোজন, লাগেজ বেল্টে ক্যামেরা স্থাপন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে যাত্রীরা আগের তুলনায় দ্রুত লাগেজ পাচ্ছেন। এসব পরিবর্তন প্রমাণ করে, তিনি যেসব সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন, সেগুলোর বাস্তবতা ছিল। তার প্রতিবাদের সুফল এখন সাধারণ যাত্রী ও বিশেষ করে প্রবাসীরা পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ শুধু দেশের মানুষই করেননি, প্রবাসীরাও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ, মিছিল ও বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাওয়ের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যারা সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের কারাভোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা, রিমান্ডে নেওয়া এবং আদালত প্রাঙ্গণে তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাকে ভয় দেখিয়ে বা মামলা দিয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাবে না। আমাদের সহকর্মী প্রমাণ করেছেন, আমরা কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না; আমরা ভয় করি একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালাকে।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও অদক্ষতার সমালোচনা মোকাবিলা না করে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে কোনো লাভ হবে না। বিরোধী দলের চরিত্র হননের চেষ্টা বাদ দিয়ে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের সমস্যা সমাধান করতে পারলে জনগণই সরকারকে সমর্থন করবে। অতীতের মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলে তা এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না।

তিনি আরও বলেন, যারা সুসময়ে পাশে থাকে, দুঃসময়ে তাদের অনেককেই পাওয়া যায় না। তাই সরকারের উচিত সাময়িক সমর্থন ও প্রশংসায় বিভ্রান্ত না হয়ে জনগণের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হওয়া।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মুক্তিলাভের পর দেশবাসী যেভাবে সহানুভূতি, সমর্থন ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, সে জন্য তার এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ করে প্রবাসী ভাই-বোনদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি তাদের ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, দেশবাসী ও প্রবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমরা তাদের পাশে থাকব। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। ইনশাআল্লাহ, সত্যের জয় হবে।

জামায়াতে ইসলামীর নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেছেন, জনগণের পক্ষে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে এবং ইসলামের পক্ষে কথা বলার সাহস মহান আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির প্রতিবাদ করায় আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও জিজ্ঞাসাবাদ করার এখতিয়ার পুলিশকে কে দিয়েছে?

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির প্রতিবাদ করেছিলাম। এজন্য আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আমার কথা হয়। আমি তাদের স্পষ্টভাবে বলি, আমাকে গ্রেপ্তার করতে হলে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখাতে হবে। কারণ আমি কোনো অন্যায় করিনি এবং আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো কিছু মেনে নেব না। একপর্যায়ে আমাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের বিষয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু আমার প্রশ্ন, আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হলো কেন?

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তার চোখ বেঁধে জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে পুলিশ কেন জানতে চাইবে? বাংলাদেশের আইন পুলিশকে এমন এখতিয়ার দেয়নি।

তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা পুলিশের দায়িত্ব নয়। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ অবশ্যই তদন্ত করবে এবং অপরাধের তথ্য উদ্ঘাটন করবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনুসন্ধানের নামে জিজ্ঞাসাবাদ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, নিম্ন আদালতে জামিন না পাওয়ার পর আমাকে উচ্চ আদালতে নেওয়া হয়। সেখানে জামিন পাওয়ার পরও বিষয়টি চেম্বার আদালতে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের আইনি ব্যবস্থা পরিচালনা করতে চাইলে জনগণ তা মেনে নেবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এভাবে দেশ পরিচালনা করতে চাইলে বাংলাদেশের মানুষ তা গ্রহণ করবে না। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা প্রতিবাদ ও আন্দোলন চালিয়ে যাব। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাব, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের বিষয়েও তাকে চিন্তা করতে হবে।

প্রবাসীদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রবাসী ভাই-বোনদের সমস্যা সমাধানে আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের জন্য একটি রিসেপশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রবাসীদের সমস্যা, অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া হবে।

এ সময় তিনি আমীরে জামায়াতের প্রতি প্রবাসীদের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার মুক্তিলাভের পর সংবর্ধনা আয়োজন এবং কারাভোগের সময়ে পাশে থাকার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তার সংগ্রামে যারা সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি তিনি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

(ডেস্ক রিপোর্ট)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *