ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিরোধী দলগুলোর মহাসমাবেশ ও বিজেপির পাল্টা মিছিল ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছে। অন্যদিকে, বিজেপি ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার প্রসঙ্গ সামনে এনে কংগ্রেসকে আক্রমণ করছে।
এদিকে, উৎসবের মৌসুমে যানজট ও সড়ক বন্ধের কারণে ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন দিল্লির ব্যবসায়ীরা। ভারতীয় বার্তাসংস্থা এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
আজ রোববার বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রামলীলা ময়দানে সমাবেশ করছেন কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। এতে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এম এ বেবি ও তেজস্বী যাদবসহ একাধিক নেতার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারসাজি চলছে।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল গত মাসে ১ নভেম্বরের এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি এর নাম দেন ‘চলো দিল্লি, ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’। তার অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক অনিয়ম চলছে। রাহুল গান্ধী নির্ভয়ে এসব প্রশ্ন তুলছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে শনিবার বিরোধীদের এক কর্মসূচিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগসংবলিত একটি প্রতীকী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে অভিযোগ করা হয়, নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্র, ১৩ কোটি ২০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, সংসদীয় তদারকি ছাড়াই ফর্ম-৬ পরিবর্তন এবং ইসিনেটের মাধ্যমে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রস্তাবে আরও অভিযোগ করা হয়, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে পাশ কাটানো হয়েছে।
বিজেপি অবশ্য বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা বলেছেন, বিরোধীদের মিছিল গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান এবং পরিকল্পিত রাজনৈতিক নাটক। তার অভিযোগ, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে, পশ্চিম দিল্লিতে পৃথক মিছিল করেছে বিজেপি। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে হরি নগর বাস ডিপো থেকে তিলক নগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত এই মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, প্রতিমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা, বিজেপি নেতা মনজিন্দর সিং সিরসা এবং সংসদ সদস্য বাঁসুরি স্বরাজ অংশ নেন।
দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও বিজেপির এই কর্মসূচিতে যোগ দেন। কংগ্রেসের সমাবেশের দিনটিকে ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার বার্ষিকীর সঙ্গে মিলিয়ে আয়োজন করার অভিযোগ তুলেছে বিজেপি।
অন্যদিকে, রামলীলা ময়দানের সমাবেশে অংশ নিচ্ছে না তরুণদের নেতৃত্বাধীন সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শনিবার দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেন। তরুণদের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ায় তাকে ধন্যবাদ জানান দীপকে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, সিজেপি নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখবে এবং বিরোধীদের রোববারের কর্মসূচিতে যোগ দেবে না।
দিল্লিতে সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, সিআরপিএফ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সসহ প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রামলীলা ময়দান ও মিন্টো ব্রিজ থেকে সমাবেশস্থল পর্যন্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন অন্তত চার হাজার সদস্য।
কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, ভগবান দাস রোড, সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের আশপাশে কয়েক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মধ্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প পথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোহিত রাজবীর জানিয়েছেন, পুরো এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আয়োজকদেরও নিজস্ব নিয়ন্ত্রণকক্ষ রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের অনুমতি অনুযায়ী রামলীলা ময়দানের সমাবেশ বিকেল ৫টায় শেষ হওয়ার কথা। তবে নির্ধারিত সময়ের পর কোনো অতিরিক্ত কর্মসূচি বা ‘চমক’ থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, সমাবেশের কারণে ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন মধ্য দিল্লির ব্যবসায়ীরা। দীপাবলির আগে উৎসবের কেনাকাটার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যানজট ও সড়ক বন্ধ থাকলে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে যেতে পারে বলে তাদের উদ্বেগ।
অটোমোটিভ পার্টস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিনয় নারাং বলেন, ব্যবসায়ীরা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে প্রতিবাদের স্থান ও সময় নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। তার মতে, সমাবেশস্থলের তিন কিলোমিটারের মধ্যে চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ, মোরি গেট ও কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা রয়েছে। এ ধরনের কর্মসূচির কারণে বাইরের শহর থেকে আসা ব্যবসায়ীরা প্রায় তিন দিন আগে ও পরে দিল্লিতে আসা এড়িয়ে চলেন।
সংগঠনটির সহসভাপতি রবীন্দ্র সিং কোহলি বলেন, দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল শ্রমিক, কুলি, মালবাহী শ্রমিক ও ঠেলাগাড়িচালকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাদের অনেকের দৈনিক আয় মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ রুপি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ধরমপাল রাত্রার আশঙ্কা, ব্যবসায়ীদের দুই হাজার রুপির বেশি ক্ষতি হতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ নাকচ করেছেন রাহুল গান্ধী। সমাবেশে আসা মানুষদের দিল্লিতে কেনাকাটা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবাদ, মিছিল ও সমাবেশের পাশাপাশি কিছু কেনাকাটাও করা যেতে পারে। এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। তার দাবি, সমাবেশে ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতি হবে না; বিজেপিই ভয় পেয়ে এ নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।
সাংবাদিক ও সাবেক আম আদমি পার্টি নেতা আশুতোষও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যেকোনো ধরনের প্রতিবাদের অধিকার থাকা উচিত, তবে তা অবশ্যই অহিংস ও শান্তিপূর্ণ হতে হবে। সহিংসতামূলক কোনো কর্মসূচি গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে না।
(ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক)।
