উত্তরাঞ্চলে তীব্র ডিজেল সংকটে বন্ধ ৪ হাজার পণ্যবাহী পরিবহন

এসব যানবাহনের চালক-হেলপারসহ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত শ্রমিকরাও আকস্মিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তরবঙ্গে এ মুহূর্তে অর্ধলাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মহীন। দেশের অন্যতম খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চল। এ অঞ্চলে আবাদ হয় ধান, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। এছাড়া স্বাদু পানির মাছ, মুরগি, গবাদিপশুর বহু খামার রয়েছে। অন্যদিকে, সোনামসজিদ-বাংলাবান্ধার মতো স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পাথর, ফল, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, সিমেন্টের ফ্লাই-অ্যাশসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়। এসব কৃষি ও আমদানি পণ্য পরিবহনে সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে চলাচল করে ১০ হাজারেরও বেশি ট্রাক-পিকআপ, যা টিকিয়ে রেখেছে শতকোটি টাকার বাণিজ্য। এ বাণিজ্যেও এখন লোকসান দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেল সংকটে ৩৫-৪০ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ চলাচল এখন প্রায় বন্ধের পথে। তিন সপ্তাহ ধরে সংকট ক্রমে বেড়েছে। দিনকে দিন এটি আরো বাড়ছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, এমন অবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ী জেলা প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তি ও পাম্প মালিকেরা।

নগরীর নওদাপাড়ার ফরিদ উদ্দিন ২২ বছর ধরে ট্রাক চালাচ্ছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমার কর্মজীবনে তেলের এমন ভোগান্তি আমি দেখিনি। তেল না পাওয়ার কারণে হাজার হাজার ড্রাইভার-হেলপার বেকার বসে দিন পার করছেন। আবার যেসব ট্রাক মালিকের নিজস্ব তেল পাম্প আছে তারা ঠিকই তাদের গাড়ি চালু রেখেছেন। যাদের নেই, তারা পেটে পাথর বেঁধে আছেন।’

একই রকম ভাষ্য ট্রাকের হেলপারদেরও। সুমন বিশ্বাস নামের এক হেলপার বলেন, ‘গাড়ি না চললে আমাদের পেটও চলে না। এক মাস ধরে এভাবে চলছে। আজ তেল পেলে কাল নেই বলছেন পাম্প মালিকরা। সপ্তাহ দুয়েক আগেও তেমন সমস্যা হচ্ছিল না; এখন অনেক গাড়িই বন্ধ পড়ে আছে।’

রাজশাহী জেলা ট্রাক-মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সাদরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি ট্রাকের পেছনে ড্রাইভার, হেলপার ছাড়াও লোড-আনলোড কাজে জড়িত থাকেন আরো পাঁচ-সাতজন শ্রমিক। সেক্ষেত্রে ১০ হাজার ট্রাকের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা কম করে ধরলেও দাঁড়ায় ৭০ হাজার বা তারও বেশি। এছাড়া মাছ, মাংস, শাকসবজি, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, মরিচ উৎপাদন ও বিপণন এবং মেরামত ও যন্ত্রপাতির ব্যবসাসহ অন্যান্য কাজের সঙ্গে জড়িতদের ধরলে আরো অর্ধলাখ শ্রমিকের হিসাব মিলবে। এরা সবাই আজ কর্মহীন।’

সাদরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার নিজের দুটি ট্রাক আছে। সেই ট্রাকে ড্রাইভার ও হেলপার কাজ করতেন। ডিজেল না পাওয়ায় তারা আজ বেকার। এমন প্রায় চার হাজার বন্ধ ট্রাকের ড্রাইভার ও হেলপারও রয়েছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন আরো পাঁচ-আটজন করে লোড-আনলোডের লেবার। তাহলে ন্যূনতম সাতজন লেবারের সঙ্গে বন্ধ হয়ে পড়া চার হাজার ট্রাকের হিসাব করলে ২৮ হাজার শ্রমিক আজ কর্মহীন।’ এক্ষেত্রে তিনি কিছু পাম্প মালিকের সিন্ডিকেশন দায়ী বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার নিজেরই প্রতিদিন ৩-৫ হাজার টাকা করে ট্রাকের ভাড়া বাবদ উপার্জন আসত। কিন্তু তা এখন বন্ধ। কারণ ডিজেল নেই। এতে আমার গত ২০-২৫ দিনে প্রায় ৫০-৭০ হাজার টাকার লোকসান হয়েছে।’

কেন্দ্রীয় বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি বজলুর রহমান রতন বলেন, ‘বাস মালিকরা এদিক থেকে বেশ ভালো আছেন। কারণ প্রায় ৯০ শতাংশ বাস মালিকের নিজস্ব পাম্প আছে, যার কারণে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ। যাদের নেই, তারা যাত্রী কমবেশি করে এক বাসে তুলে দিয়ে ভাড়া আদায় করছেন।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সামারি ক্রপ স্ট্যাটিসটিকস ২০২৪-২৫ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ধান ১ কোটি ৪৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ টন, গম সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ, ভুট্টা ৪৫-৫০ লাখ, আলু ৭৫-৮০ লাখ, পেঁয়াজ ১৪-১৬ লাখ, মরিচ পাঁচ-ছয় লাখ, শাকসবজি ৫০-৫৫ লাখ এবং অন্যান্য ফসল ২৫-৩০ লাখ টন উৎপাদন হয়। এছাড়া গবাদিপশু খাতের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে ২২ লাখ ৭৭ হাজার গরু, ভেড়া, মহিষ ও ছাগল উৎপাদন হয়েছে এবং এসব প্রাণী থেকে সাড়ে তিন লাখ টন দুধ উৎপন্ন হয়; যা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের চাহিদা মেটায়।

অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম মাছ উৎপাদন অঞ্চল বলে বিবেচিত। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। এ অঞ্চলে স্বাদু পানিতে পুকুরভিত্তিক চাষ হয়। জাতীয় উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উত্তর জনপদেরই মাছ।

জানতে চাইলে রাজশাহী কৃষি বিপণনের সিনিয়র উপপরিচালক সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘জ্বালানি ঘাটতির কারণে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। প্রতিদিন কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে সবার। শনিবার সকালে কথা হয় পুঠিয়ার ঝলমলিয়া, পবার খড়খড়িহাটসহ রাজশাহীর বিভিন্ন জায়গার একাধিক আড়তদারের সঙ্গে। তারা জানান, ট্রাক-লরি ও অন্যান্য পরিবহন সময়মতো না পাওয়ায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরবরাহে তারা বেশ বিপাকে রয়েছেন। এতে তারা মাঠপর্যায়ে পেঁয়াজ, আলু, মরিচ ও অন্যান্য ফল-ফসলের দাম পাচ্ছেন না। এদিকে উৎপাদিত দুধ, ডিমসহ মাংসের জন্য প্রস্তুত প্রাণী স্থানান্তর করতে পারছেন না খামারিরা। এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে উত্তরাঞ্চলের জেলা শহরগুলোতে হয়তোবা দাম কম থাকবে; কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বিভাগীয় শহরে কাঁচামালের দাম বহুগুণ বাড়বে। আবার উত্তরের কোল্ডস্টোরেজগুলোতে এত চাপ নেয়ার মতো সক্ষমতাও নেই যে সংরক্ষণ করা যাবে। সব মিলিয়ে ভীষণ অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।’

খড়খড়ি বাইপাসের আড়তদার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এভাবে জ্বালানি তেলের সংকট হলে রাজশাহীসহ পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ মাঠে মারা পড়বে। কৃষকদের মাঠ থেকে আনা কাঁচা শাকসবজি মোকামে তোলার পরও তা ঢাকায় পাঠাতে পারছি না। এতে পণ্যেও যেমন পচন ধরছে, তেমনি লোকসানও হচ্ছে। গাড়ির অভাব, তেলের অভাব ছাড়াও কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আড়তদারদের দুষছেন।’

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাকসুদুর রহমান রিংকু বলেন, ‘ডিজেলের অভাবে শুধু পণ্যবাহী ট্রাক নয়, কৃষকের সেচকাজেও সমস্যা হচ্ছে। এখন আম, লিচু, ধানের সময়। এ সময় পানি না পেলে কৃষকরা কীভাবে চাষাবাদ করবেন। আর বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির প্রধান উৎসই গভীর নলকূপ, যা তেল ছাড়া চলে না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে হলে জ্বালানি তেলের কতটা দরকার। এখানে কিছু উচ্চপর্যায়ের সিন্ডিকেট আছে, যারা পেট্রল-ডিজেল নিয়ে ছেলেখেলা করছে। এ নিয়ে জেলার পাম্প মালিকদের সঙ্গে বসেছিলাম। তাদেরও অভিযোগ, প্রয়োজনমাফিক তেল তারা পাচ্ছেন না। যেখানে লাগবে দিনে ১৫ হাজার লিটার, সেখানে সরকার দিচ্ছে পাঁচ হাজার লিটার। সরকারের এ বিষয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা এবং তেল নিয়ে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট হয়ে থাকলে তা কঠোরভাবে তদারক করা উচিত।’

জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মনিমুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার থেকে তেল দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা অপ্রতুল। আগে যেখানে ১৫-১৭ হাজার লিটার ডিজেল পেতাম এখন পাচ্ছি মাত্র ৯-১৩ হাজার লিটার। এখন বোরো মৌসুম। চাহিদা আরো বেশি। তাছাড়া গ্রীষ্মের ঠিক আগমুহূর্তে আম, লিচুসহ কমবেশি সব ধরনের ফসলেই পানি লাগে বেশি। সেক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন, ট্রাক্টর, ভটভটিগুলো তেল পাচ্ছে না।’ তেল সিন্ডিকেশনের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে যা পাচ্ছি তা সবই শেষ করে দিতে হয়। বরং রাখলেই সমস্যা। তাছাড়া আমার দুটো লাইসেন্স। একটা ডিলার ও একটা এজেন্সির। তার পরও আমরা প্রয়োজনমাফিক তেল পাই না, তাহলে সরবরাহ করব কীভাবে?’ প্রশ্ন করেন তিনি।

সরকার বলছে তেলের ঘাটতি নেই। তেল সরবরাহ সময়মতো হচ্ছে, তবু কেন এমন ক্রাইসিস? পাম্প মালিকদের সিন্ডিকেশন নাকি অব্যবস্থাপনা—এমন প্রশ্নে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ‘বিষয়টি আমার পুরোপুরি জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে পরে বলতে পারব। এখন ব্যস্ত আছি।’

ডিজেল ঘাটতির ফলে উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমদ শফিউদ্দিন বলেন, ‘সরকারের উচিত দেশে জরুরি কাজে নিয়োজিত পরিবহনগুলোর জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল বন্ধ করা। একই সঙ্গে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে লাগাম টেনে ধরলে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অর্থনীতির চাকাও মোটামুটি সচল থাকবে।’ (ডেস্ক রিপোর্ট)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *