যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে গাজায় ৫০০ শিশুকে হত্যা করল ইসরাইল

যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় ফের শুরু করা ইসরাইলী হামলায় কমপক্ষে ৫০০ শিশু নিহত হয়েছে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল এই তথ্য জানিয়েছে। এদিকে, শনিবার সকালে গাজায় শাম নামের এক নবজাতক শিশুকে তার পরিবারের সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালায় ইসরাইল। বোমা হামলার ফলে শিশুটির হাত কেটে ফেলতে হয় এবং এর কয়েক ঘণ্টা পর সে মারা যায়। এদিন সকালেই দুটি স্থানান্তরের আদেশ জারি করেছে ইসরাইলী কর্তৃপক্ষ।প্রথমটি শুজাইয়ায় এবং দ্বিতীয়টি খান ইউনিসে। তবে এই দুটি স্থান ছেড়ে ফিলিস্তিনিদের কোথায় যেতে হবে তা জানেন না তারা। দীর্ঘ ১৫ মাস সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইসরাইল। তারপর প্রায় দুই মাস গাজায় কিছুটা শান্তি বজায় ছিল; কিন্তু গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নে হামাসের মতানৈক্যকে কেন্দ্র করে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে ফের গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল। আল-জাজিরা, মিডল ইস্ট মনিটর।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত ১৮ মার্চ থেকে গাজায় নতুন করে শুরু হওয়া ইসরাইলী বিমান হামলায় দেড় হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও তিন হাজার ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ইসরাইলের বর্বর এই হামলা চলতি বছরের জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে দিয়েছে। জাতিসংঘের মতে, ইসরাইলের বর্বর আক্রমণের কারণে গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। এছাড়া অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ভোরে গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলায় ইসরাইলে অন্তত এক হাজার ১৩৯ জন নিহত হয় এবং ২০০-র বেশি মানুষকে বন্দি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গাজায় ভয়াবহ হামলা শুরু করে ইসরাইলী বাহিনী।

গাজায় এক দিনে নিহত ২৬

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) বিমান অভিযানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নিহত হয়েছেন ২৬ জন ফিলিস্তিনি এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০৬ জন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে এ তথ্য। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় অভিযান শুরু করে আইডিএফ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার-শুক্রবারের হামলার পর গত দেড় বছরে উপত্যকায় নিহত হয়েছেন মোট ৫০ হাজার ৯১২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৮১ জনে। এই নিহত এবং আহতদের ৫৬ শতাংশই নারী ও শিশু।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধের জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের আদালত নামে পরিচিত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাও দায়ের করা হয়েছে। তবে নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হামাসকে পুরোপুরি দুর্বল ও অকার্যকর করা এবং জিম্মিদের মুক্ত করা এই অভিযানের লক্ষ্য এবং লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে গাজায়।

ফিলিস্তিনি বন্দীকে মাথায় ইহুদি প্রতীক ‘স্টার অব ডেভিড’ এঁকে মুক্তি দিল ইসরাইল

মিডল ইস্ট আই,তিন বছর কারাগারে আটকে রেখে ফিলিস্তিনি বন্দী মুসাব কাতাবিকে গত বৃহস্পতিবার মুক্তি দিয়েছে ইসরাইল। তবে শেষ মুহূর্তেও তাঁর ওপর নির্যাতন চালায় দেশটির কারারক্ষীরা। মুক্তি দেওয়ার আগে মুসাব কাতাবির মাথা আবর্জনার বাক্সে ঢুকিয়ে দেন ইসরাইলী কারারক্ষীরা। এ ছাড়া তাঁর মাথায় ইহুদিদের প্রতীক ‘স্টার অব ডেভিড’ এঁকে দেওয়া হয়।

ইসরাইলের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরের নিজ শহর কালকিলিয়ায় মিডল ইস্ট আইকে একটি সাক্ষাৎকার দেন কাতাবি। সাক্ষাৎকারে কাতাবি বলেছেন, মাত্র ১৩ বছর বয়সে গ্রেপ্তার হওয়ার ফিলিস্তিনি কিশোর আহমেদ মানাশ্রার পাশাপাশি তাঁকেও মুক্তি দেয় ইসরাইলের কর্তৃপক্ষ। মানাশ্রাকে সাড়ে ৯ বছর পর মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁর মতো মানাশ্রাকেও মুক্তি দেওয়ার আগে নির্যাতন করা হয়েছে।

মুসাব কাতাবিমুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দী

ইসরাইলের কারাগারে থাকা অবস্থায় বেশ কিছু ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। অনেককে মারধর, নানা ধরনের নির্যাতন ও তাঁদের ওপর যৌন সহিংসতা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। গত জুলাইয়ে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী বেন গিভির গর্ব করে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনি বন্দীদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পেরেছেন তাঁরা। ইসরাইলের কারাগারে বন্দী ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে ফিলিস্তিন ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে কাতাবি বলেছেন, তাঁদের অবস্থা বিপজ্জ্বনকের চেয়ে খারাপ।

মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি কাতাবিকে ইসরাইলের নাফহা কারাগারে রাখা হয়েছিল।

গাজা যুদ্ধ বন্ধ চেয়ে চিঠি দেওয়া ১০০০ সেনাকে বরখাস্ত করল ইসরাইল

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেওয়া প্রায় এক হাজার রিজার্ভ সেনাকে বরখাস্ত করেছে ইসরাইলী সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়াল জামির গত বৃহস্পতিবার তাদের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।

এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরাইলী বিমানবাহিনীর (আইএএফ) কয়েকশ’ সদস্যসহ বরখাস্তকৃতদের অনেকে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে তারা গাজায় চলমান যুদ্ধকে ‘নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত’ বলে উল্লেখ করেন।

আল-আকসার ইমামের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিল ইসরাইল

আনাদোলু : মসজিদ আল-আকসার শেখ মুহম্মদ সেলিমকে ৭ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসরাইল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি খুতবায় ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলী বাহিনীর গণহত্যার সমালোচনা ও নিন্দা করেছেন। সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে তুরস্কের বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, গত শুক্রবার জুমার নামাজে খুতবা দেওয়ার সময় গাজা উপত্যকায় ইসরাইলী বাহিনীর সামরিক অভিযান ও অব্যাহত গোলাবর্ষণের নিন্দা জানান শেখ মুহম্মদ সেলিম। সেই সঙ্গে তিনি অভিযান বন্ধের জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বানও জানান। নামাজ শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় আল আকসার একটি ফটক থেকে শেখ মুহম্মদ সেলিমকে আটক করে ইসরাইলী পুলিশ। পরে তাকে পূর্ব জেরুজালেমের একটি থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ছেড়ে দেওয়া হয় আর দেওয়া হয় ৭ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এই সাত দিন তিনি আল-আকসা চত্বরে প্রবেশ করতে পারবেন না, যদি করেন তাকে গ্রেঢতার করা হবে।(মাহবুবুল ইসলাম)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *